বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮, ০৫:৪১ অপরাহ্ন

ধামরাইয়ের ঐতিহ্যবাহী কাঁসা- পিতল শিল্প হারিয়ে যাচ্ছে

ধামরাইয়ের ঐতিহ্যবাহী কাঁসা- পিতল শিল্প হারিয়ে যাচ্ছে

বিশেষ প্রতিবেদক, নবীন চৌধুরী
সময়ের করাল গ্রাসে লোপ পেয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী কাঁস-পিতল শিল্প । এক সময় কাঁসা-পিতল শিল্পসামগ্রী গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে নিত্য ব্যবহ্নতসামগ্রী হিসেবে দেখা যেত।কিন্তু বর্তমানে আধুনিকতার ছোয়াঁয় এসবের ব্যবহারে ভাটা পড়েছে। ঢাকা জেলার বৃহওম থানা ধামরাই কাঁসা-পিতল শিল্পের জন্য বিখ্যাত ছিল। শুধু বাংলাদেশে নয়, দেশের বাইরেও এসবের প্রচুর চাহিদা ছিল । এছাড়া বিদেশি পর্যটকরা এক সময় কাঁসাপিতলের কারুকাজখচিত জিনিস পত্র নিয়ে যেতেন কিন্তু আজ এই কাঁসা- পিতল শিল্পের ঐতিহ্য নানা সমস্যার কারণে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পের সঙ্গে জড়িত শিল্পী ও ব্যবসায়ীরা আজ অভাব – অনটনের দিন কাটাচ্ছেন । পেশা ছেড়ে চলে গেছেন অনেকেই । পৈতৃক পেশা ছেড়ে আজ কাঁসা- পিতল শিল্পে জড়িত শিল্পীরা ভিন্ন পেশায় যেতে বাধ্য হয়েছে । এই শিল্পী ও ব্যবসায়ীদের সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে কখনোই কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। ধামরাই থানার শত শত কাঁসা –পিতল ব্যবসায়ী ও শিল্পী পরিবার-ছিল। এ শিল্পের লোকদের নিয়ে কখনো কেউ ভাবে না, কখনো তাদের অভিযোগ কেউ শুনতে চায় না । এক সময় তাদের এই কাঁসা –পিতল শিল্প খুবই বিখ্যাত ছিল । তারা বিভিন্ন ধরনের শিল্পকর্ম নকশা করে বিদেশে রফতানি হতো । তাদের তৈরী থালা , কলসি ,বাটি, ঘটি ব্যবহারযোগ্য জিনিসপত্র সহ অন্যান্য জিনিসের চাহিদা ,এখন অনেকাংশে কমে গেছে। এসব তৈরি জিনিসের দাম বৃদ্ধির কারণ হলো প্রয়োজনীয় উপকরনের অভাব । বেশিভাগ ক্ষেত্রে শিল্প- ব্যবসয়ীরা ধীরে ধীরে এই পেশার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। ধামরাইয়ের কাঁসা- পিতলে জড়িত বিশিষ্ট ব্যবসায়ী প্রকাশ বনিক জানান, তাদের তৈরি জিনিসপত্রের দাম বাড়েনি খুব একটা । কিন্তু আমদানিকৃত বিভিন্ন উপকররনর দাম বেড়েছে গত ১৪/১৫বছরে প্রায় তিনগুণ। অপরদিকে ভারতীয় স্টিলের থালা বাটি , চামচ, কাটাচামচসহ বিভিন্ন জিনিসের আধিক্যের কারণে দেশীয় কাঁসা-পিতল শিল্পের জিনিসের চাহিদা যথেস্ট কমে গেছে। এসব কারণে এর সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ী ও শিল্পীরা পড়েছেন মহাফাঁপরে। তারা না পারছেন পেশায় টিকে থাকতে, না পারছেন সচ্ছলভাবে সংসার চালাতে। যারা এই পেশায় আছেন তারা কোনোরকমে টিকে রয়েছেন পেশায়। এক সময় ধামরাই ও সাভার থানার কাঁসা –পিতল শিল্পের সঙ্গে প্রায় ৩০ হাজার শিল্পী ওব্যবাসায়ী জড়িত ছিলেন। বর্তমানে পুরো থানায় কয়েকজনকে খুজেঁ পাওয়া যাবে । আগামী আট-দশ বছর পর আর এদেরকে খুজেঁ পাওয়া যাবে না । আগে প্রায় প্রতিটি গ্রামেই কাঁসা- পিতল শিল্পী ও ব্যবসায়ীদের বসবাস ছিল। সে সময়ে কাঁসা- পিতল পরীক্ষা – নিরীক্ষার টুনটান শব্দ বেজে উঠত। কিন্তু এখন সেই শব্দ যেন মিশে গেছে মহাকালের গতিপ্রবাহের সঙ্গে। কাঁসা পিতল নকশা কাজে জড়িত একজন শিল্পী অরুণ বণিকের কাছে জানা যায়, একটি কাঁসা পিতল থালা বানাতে সময় লাগে চার ঘন্টা। এতে নকশা করতে সময় লাগে ৩/৪ ঘন্টা । থালা সর্বাসাকুল্যে খরচ দাড়াঁয় ১৫০০/১০০০টাকা । ১০০/১৫০ টাকা লাভ পেলেই তারা বিক্রি করে দেন । এতে দেখা যায়, দিনে একজন নকশা শিল্পীর সর্বোচ্চ ১০০/২০০ টাকা আয় হয়্ । ধামরাইয়ের কাঁসা- পিতল সামগ্রীর বিশিষ্ট একজন ব্যবসায়ী বাবুল আক্তার চৌধুরী । ধামরাইতে তার মেটাল হ্যান্ডিক্র্যফটস নামে একটি দোকান আছে । বাবুল আক্তার মোশাররফ হোসেনের কারখানা থেকে কাঁসা –পিতলের জিনিস তৈরি করিয়ে বিভিন্ন ন্থানে বিক্রি করেন। তার দোকানে রয়েছে চোখ ধাঁধানো কারুকার্যখচিত কাঁসা-পিতলের সামগ্রী , যা সবাইকে আর্কষন করে । মোশাররফ হোসেন কারখানার প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন রাশিদা মোশাররফ । তিনি কয়েকটি দেশে কাঁসা- পিতল সামগ্রী প্রর্দশন করেন। বাবুল আক্তার জানান, সরকারের উচিত কাঁসা- পিতল সামগ্রী রফতানি এবং বিভিন্ন সময় দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী ব্যবস্থা করা। ধামরাইয়ের কাঁসা- পিতল সামগ্রীর চাহিদা আছে ইতালি, ফ্রান্স, বেলজিয়াম , কানাডা , অষ্ট্রেলিয়া ও আমেরিকায় । এমনকি অনেক দেশের রাষ্ট্রদুত ধামরাইয়ে এসে কাঁসা- পিতলের সামগ্রী নিয়ে যান। এসবের মধ্যে থাকে বিভিন্ন ধরনের মুর্তি , খাট, স্মৃতিসৌধ ,বিভিন্ন শিল্পকর্মের ছবি, জীবজন্তুর ছবিসহ বিভিন্ন জিনিস । এসব তৈরি হয় মোশাররফ হোসেন কারখানায় । এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদুত ড্যান মজিনা সহ যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকজন রাষ্ট্রদুত এসেছে প্রতিনিধি দল ধামরাই ঐতিহ্যবাহী কাসাঁ- পিতল শিল্প সামগ্রী সুকান্ত বনিকের দোকানে এবং কাসাঁ পিতলের জিনিস কিনে নিয়ে যায়। এছাড়া তারা কাসাঁ-পিতল শিল্পকে কারুকাজ দেখে প্রশংসা করেন। এছাড়া সুকান্ত বনিকের কাসাঁ পিতলের দোকানে এ পর্যন্ত বিভিন্ন্ দেশের রাষ্ট্রদুতরা এসেছে এবং কাসাঁ পিতলের জিনিস কিনে নিয়ে গেছে। কাঁসা- পিতল শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা কোনো ্ঋণ পান না। যদি সরকারএবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সহযোগিতায় এগিয়ে আসত তাহলে কাঁসা –পিতল সামাগ্রী বিদেশে রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হতো।ধামরাইয়ের কাসাঁ-পিতল বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সুকান্ত বণিক বলেন, একটি কথা বলতেই হয় দেশের ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পকে বাচাঁতে হলে এগিয়ে আসতে হবে সরকারকে এবং সহজ শর্তে করতে হবে ব্যাংক ঋণ পাওয়ার ব্যবস্থা করা।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

বিজ্ঞাপনের জণ্য ০২২




– প্রধানমন্ত্রীর ১০টি বিশেষ উদ্যোগ বিষয়ক ই-বুক –

© All rights reserved © 2018 news71online.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com