বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮, ০৬:২০ অপরাহ্ন

কফি হোক সম্প্রীতির মেলবন্ধন

কফি হোক সম্প্রীতির মেলবন্ধন

সালাহ্উদ্দিন নাগরী
‘Coffee- The Favorite drink of the Civilized World’ -Thomas Jefferson.

আজ আন্তর্জাতিক ‘কফি’ দিবস। জনপ্রিয় এ পানীয়র প্রতি ভালোবাসা ও অনুরাগ প্রকাশ, কফি চাষ, প্রক্রিয়াকরণ ও বিপণনসহ সমগ্র প্রক্রিয়ায় বিশুদ্ধতা বজায় রাখা এবং এ ক্ষেত্রটির উত্তরোত্তর উন্নতি ও বিস্তৃতি কামনাই হল আন্তর্জাতিক কফি দিবস উদযাপনের লক্ষ্য। কোনো কোনো দেশে জাতীয় কফি দিবস পালন করা হলেও সব দেশে একইদিনে পালনের জন্য আগে কোনো দিবস নির্ধারিত ছিল না। ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক কফি অর্গানাইজেশনের সিদ্ধান্ত মোতাবেক প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী কফি দিবস উদযাপনের জন্য ১ অক্টোবরকে নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাবার চাকরির সুবাদে শিশু শ্রেণী থেকে কর্মজীবনে প্রবেশ পর্যন্ত পুরো সময়টাই চট্টগ্রামে কেটেছে। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের উত্তর গেটের পাশে তৈরি হল চট্টগ্রামের প্রথম কফিশপ ‘কফিইন’। একটা অন্য ধরনের আনন্দ ও উত্তেজনা, ছাত্রছাত্রীদের কাছে এটা আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতে লাগল। ওখানে মেডিকেল কলেজ-ভার্সিটির ছেলেমেয়েদের আনাগোনা লেগেই থাকত এবং কফিসহ কিছু খেতে একজনের জন্য প্রায় ২০ থেকে ২৫ টাকা লেগে যেত। এখনও জ্বল জ্বল করছে কফিইনের সেই সোনালি দিনগুলো।

কফির দোকানগুলো হল নির্ভেজাল আড্ডা, বিনোদন ও ভাববিনিময়ের এক অনন্য পরিবেশ, মান্না দের ‘কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’ গানটি ছেলে-বুড়ো সব বাংলা-ভাষাভাষীকে আবেগে আপ্লুত করে তোলে। কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে প্রেসিডেন্সি কলেজের বিপরীতে ১৯৪২ সালে ইন্ডিয়ান কফি বোর্ড কর্তৃক সেই কফি হাউস প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি কবি, সাহিত্যিক ও সুধীসমাজের মিলনমেলায় পরিণত হয়। সন্ধ্যার পর বন্ধুবান্ধব, সমমনাদের একেকটি টেবিল দখল করে চুটিয়ে আড্ডা দেয়া, মজা করা, কফি খাওয়া, পৃথিবীজুড়ে কফি হাউসগুলোতে এ এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। সারাদিনের ক্লান্তি দূর করতে কফি হাউসগুলোর কোনো বিকল্প নেই।

কফি ছেলে-বুড়ো সব বয়সীরই বড় বেশি টানে। কিছু দিন আগে স্ত্রী-কন্যাদের নিয়ে ব্যাংকক গিয়েছিলাম। ফেরার দিন সকাল থেকে ঘোরাঘুরি করে বিকালের দিকে লেইট-লাঞ্চ সেরে হুড়োহুড়ি করছি রুমে গিয়ে গোছগাছ করার জন্য। এমন সময় ক্লান্ত কন্যাদের দাবি স্টারবাকসের কফি না খেলে চলবে না, ওই তাড়াহুড়োর মধ্যে ওদের আবদার পূরণ করতে হল। স্টারবাকস পৃথিবীর তৃতীয় বৃহৎ ফাস্টফুড চেইন-রেস্টুরেন্ট। স্টারবাকস কর্পোরেশন নামে এ কফি কোম্পানিটি ১৯৭১ সালে ওয়াশিংটনের সিয়াটলে প্রতিষ্ঠিত হয়। এ পর্যন্ত এর ২৮২১৮টি আউটলেট পৃথিবীব্যাপী পরিচালিত হচ্ছে।

কফির ইতিহাস সময়ের আবর্তে নিছক কিছু ঘটনার সমষ্টি মাত্র নয়। এর যাত্রা পথের ব্যঞ্জনা আরও একটু বেশি। দীর্ঘ যাত্রাপথে কফি কখনও তিরস্কৃত, কখনও নিষিদ্ধ, আবার কখনও প্রশংসিত হয়েছে। হাজার বছরব্যাপী উত্তেজনাপূর্ণ রোমান্সের নাম কফি, এটি শুধু একটি পানীয় নয়, অনেক ক্ষেত্রে মন-মননে ঐন্দ্রজালিক অনুভূতি সৃষ্টির অফুরান উৎস।

সেই ৯ম শতকের কথা, কালদি নামে ইথিওপিয়ার এক পশুপালক জঙ্গলের কাছে ছাগল চরানোর সময় লক্ষ করল পালের কয়েকটি ছাগল রেডবেরি জাতীয় অপরিচিত একটি গাছের ফল বা বীজ খেয়ে ভীষণ তেজময় ও কর্মচঞ্চল হয়ে উঠেছে, আনন্দে-আতিশয্যে এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করছে। আরও নিবিড় পর্যবেক্ষণে দেখা গেল, ছাগলগুলো ওই বীজ খেয়ে ছিল বলে প্রকৃতপক্ষেই তাদের উৎফুল্ল মনে হল এবং রাতের বেলায়ও ওরা কম ঘুমাল। কালদির মধ্যে ওই গাছ ও গাছের ফল নিয়ে প্রচণ্ড কৌতূহল জেঁকে বসল। সে নিজে এই ফল খেল এবং চিৎকার দিয়ে বলে উঠল, বাহ! এই ফল বেহেশত থেকে এসেছে, এটি বেহেশতি ফল। সে কাছের মসজিদ-মাদ্রাসা কমপ্লেক্সে ওই ফলগুলো নিয়ে ওখানকার বিশিষ্টজনদের কাছে এর গুণাগুণ বর্ণনা করল। তারা বিষয়টি ধর্তব্যে না নিয়ে বরং ওগুলো আগুনে ছুড়ে ফেললেন। আগুনে পোড়া সেই ফলের ম-ম গন্ধে চারদিক মাতোয়ারা হয়ে উঠল। আনন্দ-আতিশয্যে ঝলসে যাওয়া ফলগুলো দ্রুত আগুন থেকে তুলে গরম পানিতে গুলানো হল, তৈরি হল কফি এবং পরিবেশন করা হল পৃথিবীর প্রথম কফিপূর্ণ কাপটি। সেই থেকে শুরু করে আজ কফি বিপুল জনপ্রিয় পানীয়তে পরিণত হয়েছে। এখন প্রায় ২২৫ কোটি কাপ কফিতে মানুষ ঠোঁটের স্পর্শ দিয়ে প্রতিদিন বেহেশতি স্বাদ আস্বাদন করছে। অ্যারাবিকা ও রোবাস্তা নামে কফির দু’ধরনের ভ্যারাইটি আছে। অ্যারাবিকা বীন/সিড তুলনামূলকভাবে নরম, মিষ্টি ও অম্লস্বাদের হয়ে থাকে। অপর পক্ষে রোবাস্তার স্বাদ একটু তীক্ষ্ণ এবং খাওয়ার পর বাদামের স্বাদের অনুরূপ একটা রেশ থেকে যায়।

এক হাজার সালে আরব ব্যবসায়ীরা ইথিওপিয়া থেকে কফির চারা সংগ্রহ করে নিজ দেশে চাষাবাদ ও উৎপাদন শুরু করে। আরবীয়রাও কফির সিড পানিতে সিদ্ধ করে পানীয় প্রস্তুত করে, যার নাম দেয়া হয় ছধযধি, এর আক্ষরিক অর্থ ‘যা ঘুম প্রতিরোধ করে’। ইংরেজি অনেক শব্দ আরবি ভাষা থেকে এসেছে, তেমনি ছধযধি থেকে ইংরেজি ঈড়ভভবব শব্দের উৎপত্তি। এখনও মক্কা-মদিনায় হোটেল-রেস্তোরাঁয় ছোট ছোট কাপে ছধযধি পরিবেশনের রেওয়াজ চালু আছে।

তুর্কি-অটোমানদের দ্বারা কনস্টানটিনোপালে কফি চালু হয় ১৪৫৩ সালে, ষোল ও সতেরো শতকে মহামতি সুলতান সুলেইমানের সময় অটোমান সাম্রাজ্য দক্ষিণ-পূর্ব ও মধ্য ইউরোপ, দক্ষিণ এশিয়া, ককেশাস ও উত্তর আফ্রিকা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এ অটোমানদের অত্যন্ত পছন্দের পানীয় ছিল কফি, তাদের সাম্রাজ্য যতদূর বিস্তৃতি লাভ করেছে, একই ছন্দে কফিও সে পথ অনুসরণ করেছে।

পৃথিবীর প্রথম কফিশপ ‘কিভাহান’ ১৪৭৫ সালে কনস্টানটিনোপালে এবং ১৫ শতকের শেষে বা ১৬ শতকের শুরুতে মক্কাতে প্রতিষ্ঠিত হয়। আগেই বলা হয়েছে, তুরস্ক বা অটোমান সাম্রাজ্যে কফি অত্যন্ত জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং কফিপান এক ধরনের আভিজাত্যের প্রতীকে পরিণত হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিয়মিত কফিপান অপরিহার্য হয়ে ওঠে। ফলে তুরস্কে অটোমানদের আইন প্রণয়ন করতে হয়েছিল, যদি কোনো স্বামী তার স্ত্রীর কফির প্রতিদিনের বরাদ্দকৃত কোটা পূরণে ব্যর্থ হতো, তবে স্ত্রী তার স্বামীকে ডিভোর্স দিতে পারত।

ক্রুসেডের সময় থেকে ইউরোপীয়রা কফির সঙ্গে পরিচিত হয়েছিল। মুসলিম বিশ্ব থেকে এই পানীয় ইতালিয়ান বণিকদের দ্বারা বাণিজ্যনগরী ভেনিস হয়ে ইউরোপে তার পথ খুঁজে পায়। ১৬০০ সালে ইউরোপে কফি তুমুল জনপ্রিয়তা পেলে নতুন এই পানীয়র ব্যাপারে সন্দেহ, ভয় ও আশংকা প্রকাশ করে একে শয়তানের মন্দ আবিষ্কার হিসেবে অভিহিত করা হয়। পরবর্তী সময়ে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মাধ্যমে কফি ইউরোপীয় কালচারে পরিণত হয়ে ওঠে। ১৬৪৫ সালে ইউরোপের ১ম কফি হাউস ইতালিতে এবং দ্বিতীয় ইংল্যান্ডে ১৬৫১ চালু হয়। কফি হাউসগুলো দার্শনিক, বুদ্ধিজীবী, সমাজ-চিন্তকদের পদচারণায় সবসময় গমগম করত, ফলে সেগুলো বিতর্ক, মতবিনিময়, আলাপ-আলোচনার জনপ্রিয় ফোরামে পরিণত হয়ে ওঠে। ওখানে এক পেনিতে এক কাপ কফি পাওয়া যেত বলে কফি হাউসগুলো ‘পেনি ইউনিভার্সিটি’ খেতাবে ভূষিত হয়। ইউরোপের জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্মেষ, গঠনমূলক চিন্তা ও বুদ্ধিদীপ্ত অজস কর্মের সাক্ষী এই কফিশপগুলো। তাই ইউরোপীয় রেনেসাঁয় কফির গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই।

কফির উৎপাদনের সঙ্গে প্রায় ৫০টি দেশের ২ কোটির মতো কৃষক সরাসরি এবং ১২ কোটিরও বেশি মানুষ উৎপাদনের অন্যান্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত। আন্তর্জাতিক কফি অর্গানাইজেশনের তথ্যমতে, প্রতি বছর প্রায় ৯৫ লাখ টন উৎপাদিত কফির ৯০% দক্ষিণ আমেরিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোতে উৎপন্ন হয়। প্রায় ১২টি দেশে কফি প্রধান কৃষি রফতানি পণ্য। ব্রাজিল পৃথিবীর শীর্ষ কফি উৎপাদনকারী দেশ, পৃথিবীর চাহিদার প্রায় ৪০% জোগান দিয়ে থাকে ওরা। অনেকেই কফি চাষাবাদ ও উৎপাদনের সঙ্গে শিশুশ্রম জড়িত থাকা ও কীটনাশক ব্যবহারের অভিযোগ উত্থাপন করে থাকেন। কফি উৎপাদনের সামগ্রিক প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এমন কোনো কিছু থেকে সংশ্লিষ্টদের মুক্ত থাকার চেষ্টা করতে হবে।

আমাদের দেশেও বিভিন্ন সময়ে কফি চাষের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নীলফামারী জেলার কিশোরগঞ্জ উপজেলার মুন্সিপাড়া গ্রামের আবদুল কুদ্দুস ২০১৪ সালে কক্সবাজার থেকে ২৫০টি চারা সংগ্রহ করে ১৫ শতাংশ জমিতে কফি চাষ করেন। তিনি রোপিত গাছের ফল ঢেঁকিতে ভেঙে সংগৃহীত বীজ, গম ভাঙানোর মেশিনে পিষে কফি পাউডার প্রস্তুত করেন। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মতে, বিদেশ থেকে আমদানিকৃত কফির থেকেও আবদুল কুদ্দুসের কফি স্বাদ ও গন্ধে ভালো। আমাদের দেশে কফি চাষের সম্ভাবনা আরও নিবিড়ভাবে তলিয়ে দেখতে হবে, খুলেও তো যেতে পারে সম্ভাবনার আরেকটি দুয়ার।

মধ্যযুগ অর্থাৎ ইসলামের স্বর্ণযুগে (৭ম থেকে ১৫ শতক পর্যন্ত) ইস্তানবুল, বাগদাদ, দামেস্ক, কায়রো ও পরবর্তী সময়ে ইউরোপের কফিশপগুলো সমাজ গঠনে যথেষ্ট অবদান রেখেছিল। তদ্রূপ, আমাদের এই কফিশপগুলোও পরস্পরের মধ্যে ভালোবাসাকে আরও সুদৃঢ়, বহুধা বিভক্ত সমাজে ঐক্য প্রতিষ্ঠা, সবাইকে দেশ গঠনের মন্ত্রে উজ্জীবিত, নানা মত ও পথের মানুষের এক টেবিলে বসে সমস্যা সমাধানের উপায় বের করার পীঠস্থানে পরিণত হোক।

সালাহ্উদ্দিন নাগরী : সরকারি চাকরিজীবী

[email protected]

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

বিজ্ঞাপনের জণ্য ০২২




– প্রধানমন্ত্রীর ১০টি বিশেষ উদ্যোগ বিষয়ক ই-বুক –

© All rights reserved © 2018 news71online.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com