বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮, ০৫:৪০ অপরাহ্ন

রোজ গার্ডেনে শাপমোচন

রোজ গার্ডেনে শাপমোচন

এ কে এম শাহনাওয়াজ
আমাদের দেশে প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ নিয়ে নানা সংকট রয়েছে। দেশের শিক্ষিত-স্বল্পশিক্ষিত মানুষের অনেকের মধ্যেই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্ব তেমনভাবে স্পষ্ট নয়।

এসব ঐতিহ্যিক স্মৃতিচিহ্ন যে দেশের গৌরবগাথা নতুন প্রজন্মের কাছে ছড়িয়ে দেয়- তাদের উদ্দীপ্ত করে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দেশের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়- এ সত্য আমরা অনেকে বুঝতে চাই না। নানা ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলদের অসচেতনতার সুযোগে অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রত্ন ইমারত ধ্বংস হয়ে গেছে- ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। প্রত্নসম্পদ দেখভালের জন্য সরকারি দফতর সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর দায়িত্বপ্রাপ্ত।

এখানকার কর্মকর্তাদের আন্তরিকতা থাকলেও লোকবল ও বাজেট স্বল্পতায় অনেক ক্ষেত্রেই কাক্সিক্ষত সাফল্য তারা দেখাতে পারেন না। ঢাকা শহরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইমারত এর মধ্যে ধ্বংস হয়ে গেছে। ধ্বংসোন্মুখ হয়ে আছে অনেক।

পুরান ঢাকার সূত্রাপুর, ফরাশগঞ্জ, তাঁতউবাজার, শাঁখারীবাজার, চকবাজার, লালবাগ ইত্যাদি এলাকায় অনেক ঐতিহাসিক ইমারত এখনও টিকে আছে। এগুলোর একটি তালিকা প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর অনেক খেটে তৈরি করেছে।

বেসরকারিভাবেও কোনো কোনো এনজিও এসব তালিকা নিয়ে কাজ করছে। লক্ষ করেছি কোনো পক্ষ কোনো এক দুর্বোধ্য কারণে সব প্রত্ন ইমারত সংরক্ষণের তালিকায় আনতে চান না। আনতে পারলে নিঃসন্দেহে খুব ভালো একটি কাজ হতো। তাহলে পুরান ঢাকার অনেকটা এলাকাকে সংরক্ষিত প্রত্ননগরী হিসেবে ঘোষণা দেয়া যেত। তবে কার্যত তা বাস্তবসম্মত নয়। তারপরও প্রত্ন ঐতিহ্যের গুরুত্ব অনুধাবন করতে না পারায়, ভূমি দখলের লোভে, সংশ্লিষ্টজনদের অদক্ষতা ও নির্মমতায় স্বাধীনতা-উত্তরকালে অনেক প্রত্ন ইমারত ধ্বংস হয়েছে। ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে চকবাজারের চুড়িহাট্টা মসজিদ।

হারিয়ে যাওয়ার পথে এসে দাঁড়িয়েছে ছোটকাটরা, বড়কাটরা। রূপলাল হাউস এখন পেঁয়াজ-মরিচের আড়তের ভেতর ডুবে যাচ্ছে। চোখের সামনে থাকা ঢাকা গেটের মরণদশা। জিঞ্জিরা দুর্গত দখলদারদের হাতে দিয়ে আত্মসমর্পণ করে বসে আছি। ইংরেজ শাসনযুগে আধুনিক কৃষি-গবেষণার স্মারক ফার্মগেটে খামারবাড়ির ল্যাবরেটরি বিল্ডিংটি চোখের সামনে গুঁড়িয়ে ফেললাম এই সেদিন। এসব দেখে মনে হচ্ছিল আমাদের প্রত্ন স্মৃতিচিহ্নগুলো কোনো ক্ষমতাবান মুনি-ঋষির অভিশাপগ্রস্ত।

এমন বাস্তবতায় আমরা রাজধানীর টিকাটুলির কাছে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী রোজ গার্ডেনের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত ছিলাম। ঔপনিবেশিক যুগের প্রত্ন ঐতিহ্য ধারণ করে আছে এই সুরম্য অট্টালিকা আর গোটা বাড়ি। নানা সময়ে মালিকানার হাতবদলটিও ইতিহাসের অনুষঙ্গ। অবশেষে একটি বিশেষ মাত্রা যুক্ত হয়েছিল এ বাড়িটির ইতিহাসে। এটিই ছিল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের আঁতুড়ঘর।

সবশেষে স্বস্তির কথা, এ বাড়িটিতে শাপমোচন ঘটেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি পড়েছে এ ইতিহাস ধারণ করা বাড়িটির ওপর। তার নির্দেশনায় গণপূর্ত বিভাগ সম্প্রতি মালিকদের কাছ থেকে কিনে নিয়েছে বাড়িটি। প্রধানমন্ত্রী এখানে নগর জাদুঘর স্থাপনের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। সেই লক্ষ্যে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় একটি কমিটিও গঠন করেছে। এখন আশা করব নিয়মমাফিকই সব এগোবে। তবুও সিঁদুরে মেঘের ভীতি কিছুটা থেকে যায়।

অভিজ্ঞতা দিয়ে বলতে পারি, আমাদের দেশে প্রত্ন ঐতিহ্য রক্ষা, সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের ক্ষেত্রে একটি ‘সবাই রাজা’ ধরনের সংকট আছে। আর আছে ইতিহাস ও ঐতিহ্যবোধে একটি খণ্ডিত ধারণা। মনে হয় প্রত্ন সংস্কৃতির গুরুত্ব সবার কাছে অনেকটা যেন অস্পষ্ট। অদ্ভুত শোনালেও প্রশ্নটিকে উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রত্নতত্ত্ব চর্চার বয়স তিন দশকের বেশি নয়। এ কারণে শিক্ষিত দায়িত্বশীল অনেকের মধ্যে এখনও প্রত্নতত্ত্ব ও প্রত্ন ঐতিহ্যের গভীরতা বোঝার ক্ষেত্রে অস্পষ্টতা রয়েছে। ইতিহাস বোধটাও কি খুব স্পষ্ট হয়েছে? ডাক্তারি বিদ্যার মতো ইতিহাস যে একটি বিশেষায়িত বিষয় সেভাবে কি আমরা সব সময় ভেবে থাকি?

চোখের বিশেষজ্ঞ ডাক্তার কি হার্টের চিকিৎসা করবেন? আধুনিক যুগপর্বের সামাজিক, রাজনৈতিক ইতিহাস বিশেষজ্ঞ শিক্ষক কি (ব্যতিক্রম ছাড়া) প্রাচীন বাংলার শিল্পকলা বা তাম্রলিপির ক্লাসে বক্তৃতা করবেন? অথবা মধ্যযুগের আরবি-ফারসি শিলালিপি ও মুদ্রা বিশ্লেষণ করে বা পোড়ামাটির শিল্প কিংবা মূর্তিতত্ত্ব বিচার করে ইতিহাস নির্মাণ করা তার পক্ষে সম্ভব হবে? প্রত্ন অঞ্চলের সংকট আর অরাজকতা অনুসন্ধান এবং প্রস্তাবনা করার দায়িত্ব কোন পাত্রে অর্পণ করা উচিত তা কি আমরা ভেবে দেখি? কিন্তু এদেশে সবই হয়।

পরিচিত অথবা সেলিব্রেটি ইতিহাসবিদ বা সাংস্কৃতিক কর্মী হলেই হল, জাত বিচার না করে বিশেষায়িত বিষয়ের দায়িত্ব দিয়ে ফেলি। দায়িত্বশীল অনেকে দেশের প্রতি ভালোবাসার আবেগে প্রত্নসম্পদ রক্ষার পথঘাট না বুঝে বড় বড় সিদ্ধান্ত দিয়ে ফেলেন। তাতে চোখের মলম পায়ের ঘায়ে লাগানোর মতো বিড়ম্বনা তৈরি হয়। আর এর ফলাফল যা হওয়ার তাই হচ্ছে এখন।

প্রত্নতাত্ত্বিক বস্তু যে একটি দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রামাণ্য দলিল এ কথা সবাই মানবেন।

অথচ লালবাগ দুর্গের জায়গা দখল করে ভূমিদস্যুরা ভেতরে ঢুকে পড়েছিল, প্রত্ন আইন লংঘন করে দুর্গের অভ্যন্তরে শুটিং হচ্ছে, মাজারের দোহাই দিয়ে কিছুকাল আগেও ক্ষমতাবানরা মহাস্থানগড়ে আড়াই হাজার বছর আগের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য গুঁড়িয়ে দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল। অথচ দেশে বড় সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো নীরবতা পালন করছে! কয়েক বছর আগে সংবাদপত্রে দেখেছি মহাস্থান গড়ে মাজার কমিটির তত্ত্বাবধানে বহুতল ভবন নির্মাণ করতে গিয়ে প্রত্ন আইনের তোয়াক্কা না করে পূর্বপুরুষের গড়া হাজার বছরের সংস্কৃতির পাঁজরে গাঁইতি শাবলের আঘাত হানা হয়েছিল। সংস্কৃতি-মূর্খ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তারা নিজেদের অজ্ঞতা, লোভ বা মোসাহেবি চরিতার্থের জন্য প্রত্ন সম্পদ ধ্বংস করছেন।

পুরান ঢাকার প্রত্ন ইমারতগুলোর সংস্কার সংরক্ষণ নিয়ে দীর্ঘদিন থেকেই নানা সংকট এবং চর্চা চলছে। আমি অধিদফতরের তত্ত্বাবধানে এসব কমিটিতে কাজ করেছি। আমার বরাবর মনে হয়েছে সঠিক সিদ্ধান্তের জন্য কোনো একক অভিভাবক পাওয়া যাচ্ছে না। প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর এক রকম ভাবছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে রাজউকের অভিভাবকত্ব। প্রত্নতত্ত্ববিদদের ভাবনা এক ধরনের।

কোনো কোনো স্থপতি ভাবছেন এ নিয়ে চিন্তা করার এখতিয়ার তাদেরই। আর দক্ষিণ ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র যেহেতু নগর মেয়র, তাই জনপ্রতিনিধির দায় তো তার থাকবেই। এত সন্ন্যাসী থাকায় এবং নানা মুনির নানা দৃষ্টিভঙ্গির সিদ্ধান্ত থাকায় কাজের কাজ শেষ পর্যন্ত অনেক কিছুই হচ্ছে না।

আমার ধারণা সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় এ বাস্তবতাটি অনুধাবন করেছেন। ভারসাম্য রক্ষার মতো বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেছে রোজ গার্ডেন সংস্কার, রক্ষণাবেক্ষণ, জাদুঘর গড়া ইত্যাদি বাস্তবায়নের জন্য। এখন স্থল আর প্রত্ন ইমারত রক্ষার বিজ্ঞানমনস্ক সিদ্ধান্তগুলো ধারণ করে যাতে যাবতীয় দায়িত্ব সম্পাদিত হয়। কারণ ভীতিমুক্ত হতে পারছি না। ২০০০ সালে বিশ্ব ঐতিহ্য বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ সংস্কার-সংরক্ষণের দায়িত্বও মন্ত্রণালয়ের গঠিত কমিটির মাধ্যমেই হয়েছিল। তখন ইউনেস্কোর পৃষ্ঠপোষকতায় বিশাল বাজেট হয়েছিল। কিন্তু কমিটির বিশেষজ্ঞরা খুব একটা মনোযোগ দিতে পারেননি। প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের সে সময়ের প্রধান প্রকৌশলী নাকি যাবতীয় তত্ত্বাবধান করেছেন। ফলে ইতিহাস বিকৃত হয়ে পড়েছিল।

সম্ভবত ২০০২ সালে বিশ্ব ঐতিহ্য বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ সংস্কারের নামে সুলতানি যুগের মৌলিক ঐতিহ্যের অনেকটাই নষ্ট করে ফেলা হয়েছিল। সংস্কারকালীন ভিডিও দেখেছিলেন এমন একজন কর্মকর্তা জানালেন কেউ একজন এ বিষয়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলীকে প্রশ্ন করেছিলেন এভাবে যে, রূপান্তর করলেন ইতিহাসবিদরা দেখলে কথা তুলবেন।

উত্তরে নাকি প্রকৌশলী বলেছিলেন- ‘ইতিহাসবিদ কী জানেন, প্রকৌশলী জানেন কীভাবে বিল্ডিং শক্ত করতে হয়।’ আমি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ভাবলাম এভাবেই প্রত্ন ইমারত ‘শক্ত’ হচ্ছে। সে সময় এ নিয়ে লেখালেখি করেছিলাম। সেটা সরকারের নজর কাড়ে। সম্ভবত এর বছরখানেক পরে খুলনাতে সেমিনারের আয়োজন করা হয়। অনেক বিশেষজ্ঞের উপস্থিতি ছিল। সংস্কৃতিবিষয়ক সংসদীয় কমিটির সভাপতিও উপস্থিত ছিলেন। সভায় আমার প্রশ্নের মুখোমুখি করা হয়েছিল প্রধান প্রকৌশলীকে। সে সময়ের অভিজ্ঞতায় বুঝতে পেরেছিলাম প্রত্ন-প্রকৌশল জ্ঞান ছাড়া অন্য কারও হাতে ঐতিহাসিক স্থাপনা রক্ষা করা কঠিন।

আমি শরীয়তপুরে দেড় যুগ আগে মনসাবাড়ি নামে পরিচিত প্রত্ন ইমারতে সমৃদ্ধ একটি বাড়ি নিয়ে গবেষণা করেছিলাম। সে সময় জানতে পারি এরও বেশ কয়েক বছর আগে একজন দায়িত্বশীল আমলা কৌতূহলবশত মজুর ডেকে খনন করে প্রত্ন স্থলের দারুণ ক্ষতি করেছিলেন। বছরখানেক আগে সরকারের এক গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে বিশ্বসভ্যতার ওপর গ্যালারি করা হবে। বিষয়টির বিন্যাস, লিটারেচার তৈরি ইত্যাদি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমাকে ডাকা হয়েছিল। অনেকদিন খেটেখুটে একটা কিছু দাঁড় করিয়েছিলাম।

একদিন জানলাম বিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানপ্রধান এ বিষয়ে নিজে বিশেষ জ্ঞান রাখেন বলে এর অনেক পরিবর্তন করেছেন। চূড়ান্ত যে লিটারেচার দাঁড় করিয়েছেন তা একবার দেখে দেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আমাকে দিলেন। আমি দেখলাম সভ্যতার ইতিহাসের ধারাবাহিকতার সঙ্গে এখানে অনেক সংঘাত রয়েছে। তবুও কর্তার ইচ্ছেতেই কর্ম হবে।

আজ রোজ গার্ডেনের সংস্কার-সংরক্ষণ ও জাদুঘর বিন্যাসের এ আয়োজনের শুরুতে উল্লিখিত অভিজ্ঞতাসমূহের আলোকে কিছুটা শংকা তো ছুঁয়ে যাচ্ছেই। তবে স্বস্তির কথা এই যে, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রীর প্রতি আমার ব্যক্তিগত আস্থা রয়েছে। তিনি নিজে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। তার গঠিত কমিটির প্রতিও সবাই আস্থা রাখবেন আশা করি।

এ প্রত্ন স্থাপত্য ও প্রত্নক্ষেত্র যথানিয়মে সংস্কার-সংরক্ষণ করতে হলে সংশ্লিষ্টদের বিশেষজ্ঞ-ধারণা নিয়ে বিজ্ঞানমনস্কভাবে এগোতে হবে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার দক্ষতা যুক্ত হলে সাফল্যের সঙ্গে লক্ষ্য পূরণ সম্ভব হবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

বিজ্ঞাপনের জণ্য ০২২




– প্রধানমন্ত্রীর ১০টি বিশেষ উদ্যোগ বিষয়ক ই-বুক –

© All rights reserved © 2018 news71online.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com