বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮, ০৫:৫৩ অপরাহ্ন

গন্তব্য মিশনপাড়া

গন্তব্য মিশনপাড়া

শিমুল খালেদ

পড়ন্ত দুপুরে লামার মূল সড়ক ধরে হাঁটছি। মেঘলা আকাশ। সড়কের পাশের টং দোকানে পাহাড়ি কলার ঝুলন্ত কাঁদি। কিছুক্ষণ আগেই দুপুরের খাবার খেয়েছি। তার পরও জুমের পাকা কলা দেখে লোভ সামলাতে পারলাম না। দোকানের পেছন থেকে খোলা প্রান্তর গিয়ে থেমেছে দূর পাহাড়ে। পাহাড়জুড়ে সেগুনের বন। মাঝখানে সবুজ ধানক্ষেত। সেগুনের বন পেরিয়ে বাঁ পাশে চোখ ফেরাতে একটি পাহাড়ে চোখ আটকে গেল। সেখানে হলুদ পাখির ঝাঁকের মতো দেখা যাচ্ছে। কোনো নড়াচড়া নেই। পাখি হলে এতক্ষণে দু-একটার ওড়াউড়ি দেখা যেত। কিছুক্ষণ আগেই বৃষ্টি হয়ে গেছে। বৃষ্টিভেজা লামার পিচঢালা পথ ধরে আবার হাঁটতে শুরু করি। কক্সবাজার থেকে লামার উদ্দেশে সকাল সকাল রওনা দেওয়ার কথা ছিল। চকরিয়া বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছতে বেলা গড়িয়ে পড়েছে। লামাগামী চান্দের গাড়িতে আমার পাশের সিটের যাত্রী ছিলেন এক মারমা তরুণী। কক্সবাজার শহরের কলেজপড়ুয়া নাইসুমংও লামা যাচ্ছে। রোমাঞ্চকর পথের চড়াই-উতরাই শেষে চান্দের গাড়ি নামিয়ে দিল লামা বাসস্ট্যান্ডে। লামার মূল পথ সামনে গিয়ে দুই ভাগ হয়ে ডানে-বাঁয়ে চলে গেছে। ডান পাশের পথ ধরে এগিয়ে বাঁয়ে মোড় নিলে সরকারি রেস্টহাউস। এর কাছেই সাজিয়ে রাখা ভাড়ায় চালিত কয়েকটি মোটরসাইকেল। গন্তব্য এখন লামাবাজার থেকে দূরে মাতামুহুরী নদীর উজানের মিশনপাড়া। এখান থেকে মোটরসাইকেলের যাত্রী হতে হবে। আমাদের বাহনের তরুণ চালকের নাম রুপম চাকমা। লামাবাজার পেরোনোর পর সমতল আর পাহাড়ের মিশেলে গড়ে ওঠা ভূমি। সমতলে ধানের ক্ষেত। মাঝেমধ্যে ঘরবাড়ি। আচমকা বাইক থেমে গেল। রুপমদা একগাল হেসে জানাল, পথ ছ্যাস! সেখানটায় কিছু দোকানপাট। পাহাড়িদের দোকানের সামনে ছোট টেবিলে সাজিয়ে রাখা জুমের পাকা পেঁপে আর কলা। তারপর পথের বাঁক পেরোলেই খরস্রোতা মাতামুহুরী।

উজান থেকে এঁকেবেঁকে এসে এখান থেকে আবার বাঁয়ে মোড় নিয়ে ভাটির পানে ছুটে চলেছে মাতামুহুরী। বেশ তার স্রোত। দূরে খাড়া পাহাড়ের পাথুরে পাদদেশে ধাক্কা খেয়ে দিক পাল্টে ছুটে চলেছে সেই স্রোত। কোথাও আবার স্রোত কুণ্ডলী পাকিয়ে ছুটেছে। হঠাত্ দেখি, ভোজবাজির মতো একটা নৌকা স্রোতের বিপরীতে ভেসে চলেছে! নৌকায় কয়েকজন যাত্রী। কোনো বইঠা নেই, মাঝি নেই! অথচ প্রবল স্রোতের মধ্যেই নদীর ওপার থেকে সোজাসুজি এই পারে আসছে। ভালো করে তাকাতেই গোমর ফাঁস হলো। নদীর এপার থেকে ওপারে টান টান করে শক্ত দড়ি বেঁধে রাখা। সেই দড়িই বইঠা-মাঝিবিহীন নৌকা পার হওয়ার রহস্য।

নদীর তীর থেকে কাছেই মিশনপাড়ার প্রবেশগেট। পাড়ার ভেতর পথের দুই পাশে নানা জাতের ফলজ গাছ। কুটিরগুলোর নির্মাণশৈলীতে চোখে পড়ে আধুনিকতা আর পাহাড়িদের ঐতিহ্যবাহী শিল্পরীতির মেলবন্ধন। কুচকুচে কালো কাঠের এক কুটিরের পর সামনের টিলার বাঁক পার হতেই খেলার মাঠ। বিকেলবেলা ফুটবল খেলায় মেতেছে পাড়ার কিশোর-যুবারা। মাঠ পেরিয়ে পাড়ার মিশন স্কুল। বারান্দায় কিশোর ছাত্র-ছাত্রীরা বইপত্র নিয়ে খোশগল্পে মেতে আছে। স্কুলের একজন শিক্ষকের কাছে জেনে নিলাম স্থানীয় বাসিন্দা জগদীশ তঞ্চঙ্গ্যার বাসা। এক বন্ধু খোঁজ দিয়েছেন তাঁর। দেখা করলে সুবিধা হবে ভেবে তাঁর বাসায় যাই। কিন্তু তিনি বাসায় ছিলেন না। পাড়ায় আরেক চক্কর দিয়ে ফেরার পথে দেখি, ছোট্ট এক শিশু কলসি কাঁখে পানি আনতে চলেছে।

ফেরার পথে এবার আর বাইক নিলাম না। হেঁটে চারপাশটা দেখতে দেখতে ফিরব। পথের একপাশে পাহাড়ি ছড়া, আরেক পাশে পাহাড়। তারপর ধানক্ষেতের সবুজ পেরিয়ে দূরের পাহাড়জুড়ে সারি সারি জুমের পেঁপেগাছ। পাহাড় হলুদ করে রেখেছে পেঁপেগাছের পাকা পাতা। লামা বাজারের টং দোকান থেকে দৃষ্টিভ্রম হওয়া হলুদ পাখির গোমর এতক্ষণে ফাঁস হলো।

লামায় ফেরার পর ঢু মারলাম পাহাড়িদের ফলমূল-তরিতরকারির হাটে। গহিন পাহাড়ের জুমে হাড়ভাঙা পরিশ্রমে ফলানো পাকা জাম্বুরা, পেঁপে, পাহাড়ি কলা, কাসাভা আলু আর নানা জাতের তরিতরকারির পসরা। বিক্রেতাদের প্রায় সবাই পাহাড়ি মহিলা। সব কিছু ছাপিয়ে দৃষ্টি কেড়ে নিল জুমের ফসল মারফা। মারফার কথা আগে শুনলেও এবারই প্রথম দেখা। স্বাদ শসার মতো হলেও গায়েগতরে শসা থেকে বেশ মোটাসোটা। অনেকটা কুমড়ার মতো। আবার রঙের দিক থেকে বাঙ্গির জাতভাই বলা যায়। জুম থেকে পরিপক্ব মারফা তোলা হয় আশ্বিন-কার্তিক মাসে। দুই কেজি মারফা কিনে হাট থেকে বেরিয়ে আসি। একটি পুকুরে গোসলরত শিশুদের জটলা চোখে পড়ে। জানলাম, এটা পাহাড়ের অনাথ শিশুদের আশ্রম। বাসের হর্নের শব্দ পাই। এবার ঘরে ফেরার পালা।

কিভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে কক্সবাজারগামী বাসে চকরিয়া। সেখান থেকে চান্দের গাড়ি কিংবা বাসে লামা। এরপর মোটরসাইকেলে মিশনপাড়া, ভাড়া জনপ্রতি ২০ টাকা। হেঁটে গেলে মিনিট বিশেক। থাকা-খাওয়ার জন্য লামায় গেস্টহাউস ও মাঝারি মানের হোটেল রয়েছে।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

বিজ্ঞাপনের জণ্য ০২২




– প্রধানমন্ত্রীর ১০টি বিশেষ উদ্যোগ বিষয়ক ই-বুক –

© All rights reserved © 2018 news71online.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com