বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮, ০৬:৫১ অপরাহ্ন

বদদোয়া করিস না…

বদদোয়া করিস না…

সামনেই আপাদের ম্যাট্রিক পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন। আব্বার হাতে টাকা নেই। কিছু ধার করা হয়েছে। আরো দরকার। ঘরে পাট আছে। দাম নাই। পানির দরে বিক্রি হচ্ছে পাট। কিন্তু টাকা তো লাগবেই। শেষে ইদ্রিস ভাইকে আব্বা বললেন, লাল ষাড় বাঁছুরটাকে বিক্রি করতে।

সে দিন বৃহস্পতিবার। করটিয়ার হাট। দুপুরে হাটে যাবেন ইদ্রিস ভাই। সাথে ভাইজানকে বলা হলো যেতে।

ঠাঠাপড়া রোদের সময় ক্ষেত থেকে দৌড়ে ধরে আনা হলো বাছুরটাকে। হাটে নেওয়ার আগে আম্মা তার গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করে দিলেন। বললেন- যা…বদদোয়া করিস না। নিরুপায় হইয়া বেচতেছি…

উদয়ের মা আম্মাকে বললেন- ভাবি, আমার হাতের চুরিজোড়া নেন- তা-ও বাছুরডা বেইচেন না।

দূরে দাঁড়িয়ে চোখ মুছছেন ভাইজান। ইদ্রিস ভাই তাড়া দিলেন…তারতারি করুইন, বেলা হইয়া যাইতাছে…..

গলার দড়ি ধরে টান লাগালেন ইদ্রিস ভাই। বাছুরটা যেতে চাইছে না। টানতে টানতেই নিয়ে যাওয়া হলো লাল বাছুরটাকে….

গলার নিচে তুলতুলে ঝুলেপড়া দুলদুলিতে আদর করলে গলা বাড়িয়ে দিত সে। ঘাস হাতে নিয়ে ডাকলে কাছে আসত। অলসভঙ্গিতে চিবাত…এসব তুচ্ছ কারণে মন খারাপ হলো খুব আমার।

বাচ্চু ভাইজানই মূলত তাকে পালতেন। স্কুল থেকে এসে কলাই-দুর্বাঘাস এনে দিতেন। চাড়িতে ধানের কুড়া, লবণ আর পানি দিয়ে ঘুটে দিতেন হাত দিয়ে। পড়িমরি করে নাক ডুবিয়ে লম্বা চুমুক লাগাতো বাছুরটা…

এই দৃশ্য দেখে হাতিলার ফুফু বলতেন- দেখ গরু বইলা এক চুমুকে পানি খায়। আর মানুষে পানি খায় তিন চাইর চুমুকে!

সন্ধ্যা থেকে আম্মা অপেক্ষা করতে থাকেন। ইদ্রিস এখনো আসে না কেন? কালকের মধ্যেই রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। প্রচণ্ড গরম তখন। বিদ্যুতের আলোবিহীন গ্রামের অন্ধকার বাড়ির চারপাশে জেঁকে বসে। দূরে হঠাৎ দু-একটা জোনাকির আলো দেখা যায়। বিছানার একপাশে পালঙ্কের রেলিংয়ে কেরোসিন কুপি জ্বালিয়ে পড়তে বসি আমি…টইটুম্বুর দীঘির পাড়ে ফুলপরিদের মেলা…

পড়তে পড়তে রাজ্যের ঘুম নেমে আসে চোখে। আমি বুঝতে পারি, কবিতা ভুল হচ্ছে। বুঝতে পারি– আমি ঘুমের ঘোরে অন্য কী যেন পড়ছি…

ঘুমের ঘোরে দিব্যি দেখছি- কয়েকদিন পরে ঈদ। কুরবানির ঈদ। বাছুরটাকে কয়েকজন কসাই জাপটে ধরেছে। চকচকে ছুরি হাতে একজন এগিয়ে আসছে গলার দিকে।

হঠাৎ ঘুম ভেঙে শুনতে পাই- ইদ্রিস ভাইয়ের গলা। নিচু গলায় বলছেন- চাচি, বাছুর বেচছি। ছয় শ ট্যাহা। গিরস্তরাই নিছে। কসাইগোর কাছে বেচলে বেশি পাইতাম। বাছুর গরুর গোস্ত কাস্টমারে টানে।

ইদ্রিস ভাই চলে যেতে থাকে। যেতে যেতে আনমনে স্বগতোক্তি করে- বাছুর নিয়া যাওনের সময় বাচ্চু ধরা গলায় কয় কি- আমার বাছুরডা পাইলেন। কসাইয়ের কাছে বেইচেন না… বাছুরটারে যিমুন কষ্টে টাইনা-হেঁচড়ায়া বেঁচতে নিছিলাম তারচেয়ে কষ্ট অইছে বাচ্চুরে টাইনা বাড়ি আনতে… হহ! কালের কন্ঠ

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

বিজ্ঞাপনের জণ্য ০২২




– প্রধানমন্ত্রীর ১০টি বিশেষ উদ্যোগ বিষয়ক ই-বুক –

© All rights reserved © 2018 news71online.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com